শিক্ষক দিবস মূলত একটি পশ্চিমা ধারণা। আমাদের প্রাচ্যে শিক্ষককে স্মরণ করার জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না। কারণ আমাদের জীবনে শিক্ষক শুধু পিতা-মাতার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন নন, তাঁরা এমন কিছু মানুষ—যাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়।
কবিতায় পড়েছি, বাদশা আলমগীর তাঁর সন্তানকে শিক্ষকের পা ধুয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ছোটবেলায় হয়তো এই কথার গভীরতা পুরোপুরি বুঝিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের অক্ষর শেখান না; অনেক সময় তিনি একজন মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে শেখান।
আমার জীবনে এমন অনেক শিক্ষক এসেছেন।
তাই আজ শিক্ষক দিবসে একজনকে আলাদা করে শ্রেষ্ঠ বলার চেষ্টা করব না। কারণ আমার কাছে প্রত্যেক শিক্ষকই আলাদা একটি গল্প। কারও কাছে পেয়েছি জ্ঞানের আলো, কারও কাছে শাসন, কারও কাছে স্নেহ, কারও কাছে আত্মবিশ্বাস; আবার কেউ হয়তো খুব অল্প সময় আমার জীবনে ছিলেন, কিন্তু তাঁর বলা একটি কথাই পরবর্তীতে বহু বছর আমাকে পথ দেখিয়েছে।
আমার শৈশবের কথা মনে পড়লে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে খানসামা উপজেলার ছাতিয়ানগড় গ্রামের পণ্ডিতপাড়া। সেখানেই আমার পড়াশোনার শুরু ব্র্যাক স্কুলে। আমার ক্লাস টিচার ছিলেন ভারতী মেম। তখন আমি খুব ছোট। আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার হাতে ধরে অক্ষর শেখানোর সেই মানুষটির অবদান কতটা বড় ছিল! বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা কীভাবে সুন্দর করতে হয়, কীভাবে পড়তে হয়, কীভাবে স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতে হয়—এসবের অনেক কিছুই তাঁর কাছ থেকে শেখা। সেই ছোট্ট বয়সে হয়তো বুঝিনি, একজন শিক্ষক যখন একটি শিশুর হাত ধরে অক্ষর লিখিয়ে দেন, তখন তিনি আসলে তার ভবিষ্যতের পথটাও একটু একটু করে তৈরি করে দেন।
এরপর শুরু হয় আমার সেল্টুশাহ মাদ্রাসার দীর্ঘ পথচলা। ক্লাস থ্রি থেকে ফাজিল পর্যন্ত—জীবনের প্রায় ১৪টি বছর আমি একদল শিক্ষকের স্নেহ, শাসন ও যত্নের মধ্যে কাটিয়েছি। জীবনের এতটা সময় একসঙ্গে কাটানোর কারণে মাদ্রাসার প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি পরিচিত মুখের সঙ্গে আজও যেন আমার শৈশবের কোনো না কোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
মরহুম সাব্বির হুজুর ও মকবুল হুজুর ও ক্বারি হুজুরের মনে পড়লে সেই ছোটবেলার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। তাঁদের কাছে আরবি, কোরআন ও ইলমে ফিকহ শিখেছি। কিন্তু তাঁরা শুধু পড়াননি—ধর্মকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, ধর্মের সৌন্দর্য ও উদারতা বুঝতে শিখিয়েছেন। তখন হয়তো তাঁদের প্রতিটি কথার গুরুত্ব বুঝতাম না। আজ বুঝি, একজন শিক্ষকের কিছু কথা ছাত্রের মনে অনেক বছর পরও ফিরে আসে।
খলিল স্যার, খবির স্যার ও ফেরেজা আপা—তাঁদের কাছ থেকেও পেয়েছি শিক্ষা, স্নেহ ও আপনজনের মতো ভালোবাসা। তাঁরা শুধু শিক্ষক ছিলেন না; আমাদের এলাকার মানুষ হিসেবেও তাঁদের সঙ্গে ছিল আত্মীয়তার মতো এক ধরনের সম্পর্ক। সেই কারণে তাঁদের স্মৃতিগুলোও আমার কাছে অন্যরকম।
আমার বাংলা শিক্ষক ফয়জার স্যার।।তাঁর কথা আলাদা করে মনে পড়ে। তাঁর পড়ানোর মধ্যে এমন একটা আন্তরিকতা ছিল যে, মাঝে মাঝে মনে হতো—তিনি যেন ক্লাসে কোনো ছাত্রকে পড়াচ্ছেন না, নিজের সন্তানকেই পড়াচ্ছেন। একজন শিক্ষক যখন ছাত্রকে নিজের সন্তানের মতো ভাবেন, তখন তাঁর পড়ানো বিষয় শুধু খাতার পাতায় থাকে না—মনের ভেতরেও জায়গা করে নেয়।
ইংরেজির কথা মনে পড়লে মনে পড়ে মরহুম আব্দুস সালাম স্যার, আইনুদ্দিন স্যার ও মনোরঞ্জন স্যারের কথা। প্রত্যেকের শেখানোর ধরন ছিল আলাদা, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল এক—আমাদের শেখানো।
আরবি ব্যাকরণের জটিল বিষয়গুলো সহজ করে বুঝিয়েছেন মাওলানা আতাউর হুজুর ও আমিনুল হুজুর।
শিউলি ম্যাডাম ও সুলতানা ম্যাডামের কাছ থেকে সামাজিক বিজ্ঞান ও কৃষিশিক্ষা শিখেছি। আসাদ স্যারের কাছে আইসিটি শিখেছি। অঙ্কের সঙ্গে আমার যে যুদ্ধ ছিল, সেই যুদ্ধে পাশে ছিলেন জিকরুল স্যার, ময়নুল স্যার ও আসাদ স্যার। আজ ভাবি, তখন হয়তো একটি অঙ্ক ঠিকমতো না পারলে শুধু অঙ্কটাই কঠিন মনে হতো। কিন্তু আমাদের শিক্ষকরা জানতেন—একটি বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া মানে শুধু সেই প্রশ্নের উত্তর শেখানো নয়; ছাত্রকে সমস্যার সমাধান করতে শেখানো।
মাওলানা ওসমান গনি হুজুর,আহতাব উদ্দিন ও রফিকুল হুজুরের কাছে হাদিস ও কোরআন শিখেছি। আর মোস্তাফিজুর ভাই—তাঁর কথা একটু আলাদাভাবে মনে পড়ে। তাঁকে আমি কখনো স্যারের মতো করে দেখিনি; সবসময় বড় ভাইয়ের মতোই মেনেছি। কিন্তু বড় ভাইয়ের মতো সেই মানুষটিই আমাকে গড়ে তুলতে অনেক কিছু করেছেন। অনেক বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন, অনেকভাবে উৎসাহ দিয়েছেন, কখনো হয়তো শাসনও করেছেন। আজ পেছনে তাকালে মনে হয়, আমার গড়ে ওঠার পেছনে তাঁরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁর প্রতি আমার আলাদা কৃতজ্ঞতা আছে।
শিক্ষকদের কথা লিখতে গিয়ে বারবার একটি বিষয় মনে হচ্ছে—আমরা ছাত্ররা হয়তো শিক্ষকদের দেওয়া প্রতিটি জিনিস সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি না। একজন শিক্ষক একটি কথা বললেন, একটি ভুল ধরিয়ে দিলেন, কোনো একটা বিষয়ে শাসন করলেন কিংবা উৎসাহ দিলেন—তখন হয়তো মনে হয়েছে, এসব তো স্বাভাবিক। কিন্তু বহু বছর পর জীবনের কোনো এক বাঁকে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়— “আচ্ছা, এই কথাটাই তো সেদিন আমার শিক্ষক বলেছিলেন!” তখন বুঝি, শিক্ষক আসলে কতটা গভীরভাবে আমাদের জীবনের ভেতরে থেকে যান।
আজ এতগুলো নাম একসঙ্গে মনে করলে বুঝতে পারি, প্রত্যেকের সঙ্গে আমার আলাদা একটি গল্প আছে। কেউ আমাকে বই পড়তে শিখিয়েছেন। কেউ সুন্দর করে লিখতে। কেউ স্পষ্ট করে কথা বলতে। কেউ ধর্মের সৌন্দর্য ও উদারতা বুঝতে। কেউ কঠিন বিষয় সহজ করে বুঝতে।
কেউ ভুল করলে আবার চেষ্টা করতে। আবার কেউ হয়তো শুধু একটি ভালো কথা বলেছেন—যেটা কোনো একসময় আমার ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কাউকে আলাদা করে বড়, কাউকে ছোট করার সুযোগ আমার নেই। আমার জীবনের শিক্ষকরা সংখ্যায় অনেক, কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের জায়গা আমার হৃদয়ে আলাদা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরেও আমার জীবনে অনেক মানুষ এসেছেন, যাঁদের কাছ থেকে শিখেছি। তাঁদের কেউ আমাকে বইয়ের বাইরে জীবন পড়তে শিখিয়েছেন, কেউ ধৈর্য ধরতে, কেউ মানুষের কথা শুনতে, কেউ সহনশীল হতে। আজ বুঝি, শিক্ষক শুধু সেই মানুষ নন, যিনি একটি শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ান। জীবনের কোনো একটি মুহূর্তে যে মানুষটি আমাদের অন্ধকার থেকে আলো দেখান, ভুল থেকে সঠিকের দিকে ফিরিয়ে দেন, কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের একটি পথ দেখান—তিনিও এক অর্থে আমাদের শিক্ষক। তাই শিক্ষক দিবসে আমার শ্রদ্ধা শুধু স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য নয়। আমার জীবনে যাঁরা কোনো না কোনোভাবে আমাকে শিখিয়েছেন, তাঁদের সবার জন্য।
আমি আজ যা কিছু ভালো করতে পারি, যা কিছু সুন্দরভাবে ভাবতে পারি, মানুষের প্রতি যতটুকু শ্রদ্ধা রাখতে শিখেছি, ভুল থেকে যতটুকু ফিরে আসতে শিখেছি—এসবের কোনোটিই আমার একার অর্জন নয়।
এর পেছনে আমার বাবা-মা, পরিবার এবং আমার শিক্ষকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। আমার মধ্যে আপনারা যতটুকু ভালো দেখেন, তার বড় একটি অংশ আসলে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া। আজ তাঁদের অনেকেই হয়তো জানেন না, তাঁদের বলা কোনো একটি কথা আমি আজও মনে রেখেছি। কোনো কোনো শিক্ষক হয়তো জানেনই না, তাঁর দেওয়া শিক্ষা আমার জীবনের কোনো এক কঠিন সময়ে আমাকে সাহস দিয়েছে।
তাঁদের সবাইকে হয়তো আলাদা করে গিয়ে বলা হয়নি—
“স্যার, আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।” “ম্যাডাম, আপনার শেখানো কথাটি আমি আজও মনে রেখেছি।” তাই আজ এই লেখার মাধ্যমে তাঁদের সবাইকে একসঙ্গে বলতে চাই—
আপনারা হয়তো আমাকে পড়িয়েছেন কয়েকটি বছর, কিন্তু আপনাদের শিক্ষা আমি বহন করছি সারাজীবন।
আপনারা আমার শুধু শিক্ষক নন; আপনারা আমার শৈশবের স্মৃতি, আমার বেড়ে ওঠার গল্প এবং আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার জীবনের সকল শিক্ষকের প্রতি রইল অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।
শুভ শিক্ষক দিবস। ❤️
লেখক:— মো: জসিম উদ্দিন
গণমাধ্যমকর্মী
রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
শিক্ষক দিবস মূলত একটি পশ্চিমা ধারণা। আমাদের প্রাচ্যে শিক্ষককে স্মরণ করার জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না। কারণ আমাদের জীবনে শিক্ষক শুধু পিতা-মাতার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন নন, তাঁরা এমন কিছু মানুষ—যাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়।
কবিতায় পড়েছি, বাদশা আলমগীর তাঁর সন্তানকে শিক্ষকের পা ধুয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ছোটবেলায় হয়তো এই কথার গভীরতা পুরোপুরি বুঝিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের অক্ষর শেখান না; অনেক সময় তিনি একজন মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে শেখান।
আমার জীবনে এমন অনেক শিক্ষক এসেছেন।
তাই আজ শিক্ষক দিবসে একজনকে আলাদা করে শ্রেষ্ঠ বলার চেষ্টা করব না। কারণ আমার কাছে প্রত্যেক শিক্ষকই আলাদা একটি গল্প। কারও কাছে পেয়েছি জ্ঞানের আলো, কারও কাছে শাসন, কারও কাছে স্নেহ, কারও কাছে আত্মবিশ্বাস; আবার কেউ হয়তো খুব অল্প সময় আমার জীবনে ছিলেন, কিন্তু তাঁর বলা একটি কথাই পরবর্তীতে বহু বছর আমাকে পথ দেখিয়েছে।
আমার শৈশবের কথা মনে পড়লে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে খানসামা উপজেলার ছাতিয়ানগড় গ্রামের পণ্ডিতপাড়া। সেখানেই আমার পড়াশোনার শুরু ব্র্যাক স্কুলে। আমার ক্লাস টিচার ছিলেন ভারতী মেম। তখন আমি খুব ছোট। আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার হাতে ধরে অক্ষর শেখানোর সেই মানুষটির অবদান কতটা বড় ছিল! বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা কীভাবে সুন্দর করতে হয়, কীভাবে পড়তে হয়, কীভাবে স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতে হয়—এসবের অনেক কিছুই তাঁর কাছ থেকে শেখা। সেই ছোট্ট বয়সে হয়তো বুঝিনি, একজন শিক্ষক যখন একটি শিশুর হাত ধরে অক্ষর লিখিয়ে দেন, তখন তিনি আসলে তার ভবিষ্যতের পথটাও একটু একটু করে তৈরি করে দেন।
এরপর শুরু হয় আমার সেল্টুশাহ মাদ্রাসার দীর্ঘ পথচলা। ক্লাস থ্রি থেকে ফাজিল পর্যন্ত—জীবনের প্রায় ১৪টি বছর আমি একদল শিক্ষকের স্নেহ, শাসন ও যত্নের মধ্যে কাটিয়েছি। জীবনের এতটা সময় একসঙ্গে কাটানোর কারণে মাদ্রাসার প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি পরিচিত মুখের সঙ্গে আজও যেন আমার শৈশবের কোনো না কোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
মরহুম সাব্বির হুজুর ও মকবুল হুজুর ও ক্বারি হুজুরের মনে পড়লে সেই ছোটবেলার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। তাঁদের কাছে আরবি, কোরআন ও ইলমে ফিকহ শিখেছি। কিন্তু তাঁরা শুধু পড়াননি—ধর্মকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, ধর্মের সৌন্দর্য ও উদারতা বুঝতে শিখিয়েছেন। তখন হয়তো তাঁদের প্রতিটি কথার গুরুত্ব বুঝতাম না। আজ বুঝি, একজন শিক্ষকের কিছু কথা ছাত্রের মনে অনেক বছর পরও ফিরে আসে।
খলিল স্যার, খবির স্যার ও ফেরেজা আপা—তাঁদের কাছ থেকেও পেয়েছি শিক্ষা, স্নেহ ও আপনজনের মতো ভালোবাসা। তাঁরা শুধু শিক্ষক ছিলেন না; আমাদের এলাকার মানুষ হিসেবেও তাঁদের সঙ্গে ছিল আত্মীয়তার মতো এক ধরনের সম্পর্ক। সেই কারণে তাঁদের স্মৃতিগুলোও আমার কাছে অন্যরকম।
আমার বাংলা শিক্ষক ফয়জার স্যার।।তাঁর কথা আলাদা করে মনে পড়ে। তাঁর পড়ানোর মধ্যে এমন একটা আন্তরিকতা ছিল যে, মাঝে মাঝে মনে হতো—তিনি যেন ক্লাসে কোনো ছাত্রকে পড়াচ্ছেন না, নিজের সন্তানকেই পড়াচ্ছেন। একজন শিক্ষক যখন ছাত্রকে নিজের সন্তানের মতো ভাবেন, তখন তাঁর পড়ানো বিষয় শুধু খাতার পাতায় থাকে না—মনের ভেতরেও জায়গা করে নেয়।
ইংরেজির কথা মনে পড়লে মনে পড়ে মরহুম আব্দুস সালাম স্যার, আইনুদ্দিন স্যার ও মনোরঞ্জন স্যারের কথা। প্রত্যেকের শেখানোর ধরন ছিল আলাদা, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল এক—আমাদের শেখানো।
আরবি ব্যাকরণের জটিল বিষয়গুলো সহজ করে বুঝিয়েছেন মাওলানা আতাউর হুজুর ও আমিনুল হুজুর।
শিউলি ম্যাডাম ও সুলতানা ম্যাডামের কাছ থেকে সামাজিক বিজ্ঞান ও কৃষিশিক্ষা শিখেছি। আসাদ স্যারের কাছে আইসিটি শিখেছি। অঙ্কের সঙ্গে আমার যে যুদ্ধ ছিল, সেই যুদ্ধে পাশে ছিলেন জিকরুল স্যার, ময়নুল স্যার ও আসাদ স্যার। আজ ভাবি, তখন হয়তো একটি অঙ্ক ঠিকমতো না পারলে শুধু অঙ্কটাই কঠিন মনে হতো। কিন্তু আমাদের শিক্ষকরা জানতেন—একটি বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া মানে শুধু সেই প্রশ্নের উত্তর শেখানো নয়; ছাত্রকে সমস্যার সমাধান করতে শেখানো।
মাওলানা ওসমান গনি হুজুর,আহতাব উদ্দিন ও রফিকুল হুজুরের কাছে হাদিস ও কোরআন শিখেছি। আর মোস্তাফিজুর ভাই—তাঁর কথা একটু আলাদাভাবে মনে পড়ে। তাঁকে আমি কখনো স্যারের মতো করে দেখিনি; সবসময় বড় ভাইয়ের মতোই মেনেছি। কিন্তু বড় ভাইয়ের মতো সেই মানুষটিই আমাকে গড়ে তুলতে অনেক কিছু করেছেন। অনেক বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন, অনেকভাবে উৎসাহ দিয়েছেন, কখনো হয়তো শাসনও করেছেন। আজ পেছনে তাকালে মনে হয়, আমার গড়ে ওঠার পেছনে তাঁরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁর প্রতি আমার আলাদা কৃতজ্ঞতা আছে।
শিক্ষকদের কথা লিখতে গিয়ে বারবার একটি বিষয় মনে হচ্ছে—আমরা ছাত্ররা হয়তো শিক্ষকদের দেওয়া প্রতিটি জিনিস সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি না। একজন শিক্ষক একটি কথা বললেন, একটি ভুল ধরিয়ে দিলেন, কোনো একটা বিষয়ে শাসন করলেন কিংবা উৎসাহ দিলেন—তখন হয়তো মনে হয়েছে, এসব তো স্বাভাবিক। কিন্তু বহু বছর পর জীবনের কোনো এক বাঁকে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়— “আচ্ছা, এই কথাটাই তো সেদিন আমার শিক্ষক বলেছিলেন!” তখন বুঝি, শিক্ষক আসলে কতটা গভীরভাবে আমাদের জীবনের ভেতরে থেকে যান।
আজ এতগুলো নাম একসঙ্গে মনে করলে বুঝতে পারি, প্রত্যেকের সঙ্গে আমার আলাদা একটি গল্প আছে। কেউ আমাকে বই পড়তে শিখিয়েছেন। কেউ সুন্দর করে লিখতে। কেউ স্পষ্ট করে কথা বলতে। কেউ ধর্মের সৌন্দর্য ও উদারতা বুঝতে। কেউ কঠিন বিষয় সহজ করে বুঝতে।
কেউ ভুল করলে আবার চেষ্টা করতে। আবার কেউ হয়তো শুধু একটি ভালো কথা বলেছেন—যেটা কোনো একসময় আমার ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কাউকে আলাদা করে বড়, কাউকে ছোট করার সুযোগ আমার নেই। আমার জীবনের শিক্ষকরা সংখ্যায় অনেক, কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের জায়গা আমার হৃদয়ে আলাদা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরেও আমার জীবনে অনেক মানুষ এসেছেন, যাঁদের কাছ থেকে শিখেছি। তাঁদের কেউ আমাকে বইয়ের বাইরে জীবন পড়তে শিখিয়েছেন, কেউ ধৈর্য ধরতে, কেউ মানুষের কথা শুনতে, কেউ সহনশীল হতে। আজ বুঝি, শিক্ষক শুধু সেই মানুষ নন, যিনি একটি শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ান। জীবনের কোনো একটি মুহূর্তে যে মানুষটি আমাদের অন্ধকার থেকে আলো দেখান, ভুল থেকে সঠিকের দিকে ফিরিয়ে দেন, কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের একটি পথ দেখান—তিনিও এক অর্থে আমাদের শিক্ষক। তাই শিক্ষক দিবসে আমার শ্রদ্ধা শুধু স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য নয়। আমার জীবনে যাঁরা কোনো না কোনোভাবে আমাকে শিখিয়েছেন, তাঁদের সবার জন্য।
আমি আজ যা কিছু ভালো করতে পারি, যা কিছু সুন্দরভাবে ভাবতে পারি, মানুষের প্রতি যতটুকু শ্রদ্ধা রাখতে শিখেছি, ভুল থেকে যতটুকু ফিরে আসতে শিখেছি—এসবের কোনোটিই আমার একার অর্জন নয়।
এর পেছনে আমার বাবা-মা, পরিবার এবং আমার শিক্ষকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। আমার মধ্যে আপনারা যতটুকু ভালো দেখেন, তার বড় একটি অংশ আসলে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া। আজ তাঁদের অনেকেই হয়তো জানেন না, তাঁদের বলা কোনো একটি কথা আমি আজও মনে রেখেছি। কোনো কোনো শিক্ষক হয়তো জানেনই না, তাঁর দেওয়া শিক্ষা আমার জীবনের কোনো এক কঠিন সময়ে আমাকে সাহস দিয়েছে।
তাঁদের সবাইকে হয়তো আলাদা করে গিয়ে বলা হয়নি—
“স্যার, আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।” “ম্যাডাম, আপনার শেখানো কথাটি আমি আজও মনে রেখেছি।” তাই আজ এই লেখার মাধ্যমে তাঁদের সবাইকে একসঙ্গে বলতে চাই—
আপনারা হয়তো আমাকে পড়িয়েছেন কয়েকটি বছর, কিন্তু আপনাদের শিক্ষা আমি বহন করছি সারাজীবন।
আপনারা আমার শুধু শিক্ষক নন; আপনারা আমার শৈশবের স্মৃতি, আমার বেড়ে ওঠার গল্প এবং আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার জীবনের সকল শিক্ষকের প্রতি রইল অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।
শুভ শিক্ষক দিবস। ❤️
লেখক:— মো: জসিম উদ্দিন
গণমাধ্যমকর্মী
মতামত