রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
উত্তরের চোখ

নুসরাত হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায়ে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনতা’ দেখল হাইকোর্ট

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের বিচারকের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, শামীম, রুহুল আমিন, মাকসুদ কাউন্সিলর ও আফসারউদ্দীনের বিরুদ্ধে ন্যূনতম কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রমাণ ছাড়াই দেওয়া ওই দণ্ডের কারণে সংশ্লিষ্ট আসামিদের প্রায় সাত বছর কনডেম সেলে থাকতে হয়েছে। এর প্রভাব তাদের পরিবারের ওপরও ‘ধ্বংসাত্মক’ হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন আদালত।মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ উঠে আসে।রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, একটি সভ্য সমাজে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন সাজা আশা করা যায় না। ট্রাইব্যুনালের বিচারকের মধ্যে সংবেদনশীলতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।আদালত আরও বলেন, দণ্ডবিধি ও সাজা প্রদানের বিধিমালার মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত না করা পর্যন্ত ওই বিচারককে দায়রা আদালতের বিচারিক কাজ পরিচালনা থেকে দূরে রাখা শ্রেয়।রায়ে বলা হয়েছে, নুসরাতকে হত্যা করে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার জন্য মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার নির্দেশ বাস্তবায়নে শাহাদাত হোসেন শামীম ও নুরউদ্দিন মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, নুসরাত মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যার জন্য শামীম, নুরউদ্দিন, জাবেদ ও জুবায়েরকে প্ররোচিত করেছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা।পূর্ণাঙ্গ রায়ে নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দিকে ‘ত্রুটিহীন’ উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত বলেন, ওই জবানবন্দি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য এবং গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে তা উত্তীর্ণ হয়েছে। এতে চার ব্যক্তির সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টি উঠে এসেছে।এ ছাড়া দণ্ডিত আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল বলেও রায়ে উল্লেখ করেছে হাইকোর্ট।আদালত বলেন, রিমান্ডে আসামিদের নির্যাতন করা হয়েছিল—মামলার নথিতে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল বলেই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অবিশ্বাস্য হয়ে যেতে পারে না।এর আগে গত ২৪ আগস্ট নুসরাত হত্যা মামলায় মূল হোতা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা ও মাদরাসার শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীমের বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট।তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১০ আসামির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় তাদের খালাস দেওয়া হয়।এ ছাড়া আরও চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারা হলেন—মাদ্রাসাছাত্র নুরউদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ এবং উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন।নুসরাত হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণ মূল্যায়ন, সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।

নুসরাত হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায়ে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনতা’ দেখল হাইকোর্ট