আইফোন দিয়ে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির সূত্র ধরে পরিচয়। সেই পরিচয়ই একসময় ঘনিষ্ঠতায় গড়ায়। পরে অপ্রতিমের আইফোনটি হাতিয়ে নেওয়ার লোভে ঘটনার সাত দিন আগে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ছবি তোলার কথা বলে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নেওয়া হয় কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায়। সেখানে প্রথমে তাঁর আইফোন নেওয়া হয়। ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয় তাকে। পরে মৃত্যু হয় অপ্রতিমের।
কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যা মামলায় তিন আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং হামলার বিষয়ে তিনজনের বক্তব্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সময়ের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ও কে কোথায় ছিল—এসব বিষয়ে তাদের বক্তব্যে কিছু পার্থক্যও রয়েছে।
কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিন জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন তুহিন।
তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। তুহিনের বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য অপ্রতিম প্রায়ই তাঁদের সঙ্গে বের হতো।
একপর্যায়ে অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তুহিন ও অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ তৈরি হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তুহিনের ভাষ্য, ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কিছুটা সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটির জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে সে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায় তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার ভাষ্য, ‘তুহিন আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে মারার প্ল্যান করে।’
অপর কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার এক বন্ধু তাকে জানায়—তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।
তিন জবানবন্দির এ অংশে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—হত্যার সিদ্ধান্তটি তাৎক্ষণিক ছিল না। আইফোনকে কেন্দ্র করে ঘটনার কয়েক দিন আগেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তিন আসামির বক্তব্যে এসেছে।
তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সেখানে অপ্রতিম তাঁকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই তুহিন টিকটকে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেই নম্বরে কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।
তুহিনের বর্ণনায়, অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটিকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল। পরিকল্পনা ছিল ছবি তোলার। এই ছবি তোলার পরিচয় ও সম্পর্ককেই শেষ পর্যন্ত অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে তিন আসামির জবানবন্দিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অপ্রতিমের চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ বছরের বড় যুবকদের সঙ্গে তাঁর মেলামেশা ও সম্পর্ককে ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় বলে তুহিন জানিয়েছেন। এরপর ‘বুদ্ধি দিয়ে’ তাঁকে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান তুহিন। জবানবন্দিতে জায়গাটিকে নির্জন এলাকা এবং তাঁর চাচা শাহ আলমের পাহাড় হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, বেলা দুইটার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে তার আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায় সে।
তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যও প্রায় একই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানেই সে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে যায়। সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে।
চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা হয়—এ বিষয়েও তিন জবানবন্দিতে মিল রয়েছে।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম তাকে আইফোনটি দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেয়।
তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ব্যবহার করে। পরে ফোনটি অপ্রতিমকে ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেয়। এরপর ফোন নিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।
পুলিশও এর আগে জানিয়েছিল, অপ্রতিম আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপরই মারধরের ঘটনা ঘটে।
তিন আসামির জবানবন্দিতে হামলার শুরু নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন।
তুহিন প্রথমে অপ্রতিমকে একটি থাপ্পড় মারেন। এরপর পাশে পড়ে থাকা একটি কোদালের হাতল নিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। পরে অন্য দুজনকেও মারতে বলেন বলে জবানবন্দিতে এসেছে।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটির বক্তব্যেও বলা হয়েছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার একপর্যায়ে তুহিন পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন।
তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, তুহিনই প্রথম কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমকে আঘাত করেন।
হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তিন জবানবন্দিতে মিল পাওয়া গেছে। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাঁদের লোভ হয়েছিল।
দ্বিতীয় কিশোর তার জবানবন্দিতে আরও স্পষ্ট করে বলেছে, আইফোনটি তুহিন বিক্রি করবেন এবং সেখান থেকে তাকে টাকার ভাগ দেওয়ার কথা ছিল। তার ভাষ্য, ‘আমাদের প্ল্যান ছিল, তুহিন ওই মোবাইল বিক্রি করে আমাকে টাকার ভাগ দিবে। এই জন্যই এই কাজ করা।’
তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যেও আইফোন বিক্রি করে টাকা ভাগ দেওয়ার কথা এসেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বলা হয়েছিল আইফোনটি বিক্রি করে পাওয়া টাকা থেকে তাকে ভাগ দেওয়া হবে।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আসামিদের অবস্থান ও ঘটনাস্থল ত্যাগের বিষয়ে তিন জবানবন্দিতে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
তুহিন বলেছেন, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন। দ্বিতীয় কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর সে ও অপর কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে আসে। তখন তুহিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে যান। তবে অপ্রতিমের আইফোনটি শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল—তিনজনের বক্তব্যেই এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
তুহিনের জবানবন্দিতে তাঁর বন্ধু মো. সিয়াম (১৯) সম্পর্কেও তথ্য এসেছে। তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাঁকে ‘সব কথা খুলে বলেন’। জবানবন্দিতে এমন দাবিও রয়েছে যে, অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনার কথা সিয়াম আগে থেকেই জানতেন।
তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি।
পুলিশ পরে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য ছিল, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন। পুলিশ সূত্রের দাবি, হত্যার দিন রাতেই তুহিন সিয়ামের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে হত্যার বিস্তারিত জানান।
জবানবন্দিতে হত্যার পরের দিনের ঘটনাও উঠে এসেছে। তুহিন বলেছেন, হত্যার পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাঁকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। পরে তিনি সিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে কোটবাড়িতে অপ্রতিমের সন্ধান করতে যান।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে অপ্রতিমকে খুঁজতে বের হয়। পরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেও ঘটনাস্থলে যায়।
অপর কিশোর জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেয়।
এর মধ্যেই পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছিল, তাঁদের বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। হত্যাকাণ্ডে আর কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
তিন আসামির জবানবন্দি পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁদের পরিচয়, আইফোনের প্রতি লোভ, আগাম পরিকল্পনা, নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, ফোন নেওয়া এবং এরপর হামলার মূল ঘটনাক্রমে বেশ কিছু মিল পাওয়া যায়। তবে হত্যাকাণ্ডে কার ভূমিকা কতটা ছিল এবং পুরো ঘটনার দায় কার ওপর কতটা বর্তায়—তার চূড়ান্ত নির্ধারণ হবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায়।
যে বিকেলে ছবি তোলার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল ১৩ বছরের অপ্রতিম, সেই বিকেলের ঘটনার পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচার—এখন সেটিই তাঁর পরিবার, সহপাঠী ও স্বজনদের প্রধান প্রত্যাশা।
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আইফোন দিয়ে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির সূত্র ধরে পরিচয়। সেই পরিচয়ই একসময় ঘনিষ্ঠতায় গড়ায়। পরে অপ্রতিমের আইফোনটি হাতিয়ে নেওয়ার লোভে ঘটনার সাত দিন আগে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ছবি তোলার কথা বলে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নেওয়া হয় কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায়। সেখানে প্রথমে তাঁর আইফোন নেওয়া হয়। ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয় তাকে। পরে মৃত্যু হয় অপ্রতিমের।
কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যা মামলায় তিন আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং হামলার বিষয়ে তিনজনের বক্তব্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সময়ের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ও কে কোথায় ছিল—এসব বিষয়ে তাদের বক্তব্যে কিছু পার্থক্যও রয়েছে।
কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিন জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন তুহিন।
তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। তুহিনের বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য অপ্রতিম প্রায়ই তাঁদের সঙ্গে বের হতো।
একপর্যায়ে অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তুহিন ও অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ তৈরি হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তুহিনের ভাষ্য, ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কিছুটা সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটির জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে সে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায় তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার ভাষ্য, ‘তুহিন আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে মারার প্ল্যান করে।’
অপর কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার এক বন্ধু তাকে জানায়—তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।
তিন জবানবন্দির এ অংশে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—হত্যার সিদ্ধান্তটি তাৎক্ষণিক ছিল না। আইফোনকে কেন্দ্র করে ঘটনার কয়েক দিন আগেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তিন আসামির বক্তব্যে এসেছে।
তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সেখানে অপ্রতিম তাঁকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই তুহিন টিকটকে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেই নম্বরে কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।
তুহিনের বর্ণনায়, অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটিকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল। পরিকল্পনা ছিল ছবি তোলার। এই ছবি তোলার পরিচয় ও সম্পর্ককেই শেষ পর্যন্ত অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে তিন আসামির জবানবন্দিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অপ্রতিমের চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ বছরের বড় যুবকদের সঙ্গে তাঁর মেলামেশা ও সম্পর্ককে ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় বলে তুহিন জানিয়েছেন। এরপর ‘বুদ্ধি দিয়ে’ তাঁকে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান তুহিন। জবানবন্দিতে জায়গাটিকে নির্জন এলাকা এবং তাঁর চাচা শাহ আলমের পাহাড় হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, বেলা দুইটার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে তার আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায় সে।
তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যও প্রায় একই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানেই সে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে যায়। সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে।
চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা হয়—এ বিষয়েও তিন জবানবন্দিতে মিল রয়েছে।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম তাকে আইফোনটি দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেয়।
তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ব্যবহার করে। পরে ফোনটি অপ্রতিমকে ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেয়। এরপর ফোন নিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।
পুলিশও এর আগে জানিয়েছিল, অপ্রতিম আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপরই মারধরের ঘটনা ঘটে।
তিন আসামির জবানবন্দিতে হামলার শুরু নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন।
তুহিন প্রথমে অপ্রতিমকে একটি থাপ্পড় মারেন। এরপর পাশে পড়ে থাকা একটি কোদালের হাতল নিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। পরে অন্য দুজনকেও মারতে বলেন বলে জবানবন্দিতে এসেছে।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটির বক্তব্যেও বলা হয়েছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার একপর্যায়ে তুহিন পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন।
তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, তুহিনই প্রথম কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমকে আঘাত করেন।
হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তিন জবানবন্দিতে মিল পাওয়া গেছে। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাঁদের লোভ হয়েছিল।
দ্বিতীয় কিশোর তার জবানবন্দিতে আরও স্পষ্ট করে বলেছে, আইফোনটি তুহিন বিক্রি করবেন এবং সেখান থেকে তাকে টাকার ভাগ দেওয়ার কথা ছিল। তার ভাষ্য, ‘আমাদের প্ল্যান ছিল, তুহিন ওই মোবাইল বিক্রি করে আমাকে টাকার ভাগ দিবে। এই জন্যই এই কাজ করা।’
তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যেও আইফোন বিক্রি করে টাকা ভাগ দেওয়ার কথা এসেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বলা হয়েছিল আইফোনটি বিক্রি করে পাওয়া টাকা থেকে তাকে ভাগ দেওয়া হবে।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আসামিদের অবস্থান ও ঘটনাস্থল ত্যাগের বিষয়ে তিন জবানবন্দিতে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
তুহিন বলেছেন, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন। দ্বিতীয় কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর সে ও অপর কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে আসে। তখন তুহিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে যান। তবে অপ্রতিমের আইফোনটি শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল—তিনজনের বক্তব্যেই এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
তুহিনের জবানবন্দিতে তাঁর বন্ধু মো. সিয়াম (১৯) সম্পর্কেও তথ্য এসেছে। তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাঁকে ‘সব কথা খুলে বলেন’। জবানবন্দিতে এমন দাবিও রয়েছে যে, অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনার কথা সিয়াম আগে থেকেই জানতেন।
তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি।
পুলিশ পরে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য ছিল, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন। পুলিশ সূত্রের দাবি, হত্যার দিন রাতেই তুহিন সিয়ামের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে হত্যার বিস্তারিত জানান।
জবানবন্দিতে হত্যার পরের দিনের ঘটনাও উঠে এসেছে। তুহিন বলেছেন, হত্যার পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাঁকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। পরে তিনি সিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে কোটবাড়িতে অপ্রতিমের সন্ধান করতে যান।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে অপ্রতিমকে খুঁজতে বের হয়। পরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেও ঘটনাস্থলে যায়।
অপর কিশোর জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেয়।
এর মধ্যেই পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছিল, তাঁদের বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। হত্যাকাণ্ডে আর কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
তিন আসামির জবানবন্দি পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁদের পরিচয়, আইফোনের প্রতি লোভ, আগাম পরিকল্পনা, নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, ফোন নেওয়া এবং এরপর হামলার মূল ঘটনাক্রমে বেশ কিছু মিল পাওয়া যায়। তবে হত্যাকাণ্ডে কার ভূমিকা কতটা ছিল এবং পুরো ঘটনার দায় কার ওপর কতটা বর্তায়—তার চূড়ান্ত নির্ধারণ হবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায়।
যে বিকেলে ছবি তোলার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল ১৩ বছরের অপ্রতিম, সেই বিকেলের ঘটনার পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচার—এখন সেটিই তাঁর পরিবার, সহপাঠী ও স্বজনদের প্রধান প্রত্যাশা।
মতামত