প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬
শয্যা নেই হাসপাতালে, গাছতলায় অসুস্থ শিশু নিয়ে অভিভাবকেরা!
সোহাগ ইসলাম , ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি ||
ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে মূল ফটকের সামনের গাছতলায় বিছানা পেতে অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে অবস্থান করছেন অভিভাবকেরা। হাসপাতালের ভেতরে শয্যা তো দূরের কথা, সামান্য বসার জায়গাও মিলছে না অনেকের। বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচেই সন্তানদের নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। কারও শিশুর হাতে চলছে স্যালাইন, কেউ অপেক্ষা করছেন চিকিৎসা কিংবা প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য। অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে তৈরি হয়েছে অসহনীয় পরিবেশ।হাসপাতালের ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে বুধবার ভর্তি ছিল ২১৫ জন শিশু। নির্ধারিত শয্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগী থাকায় শয্যা ছাড়িয়ে ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দাতেও রাখা হয়েছে শিশুদের। এরপরও জায়গার সংকুলান না হওয়ায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালের বাইরের গাছতলায় অবস্থান করছেন।অভিভাবকদের অভিযোগ, ওয়ার্ডে অতিরিক্ত ভিড়ের পাশাপাশি প্রচণ্ড গরম, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপরিচ্ছন্ন ও অপর্যাপ্ত শৌচাগার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হওয়ায় তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স তাজনেহার জানান, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।পঞ্চগড়ের বিউটি বেগম তাঁর ১৭ মাস বয়সী নাতিকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। শিশুটি জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। এবার টাইফয়েড ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বিউটি বেগম বলেন, ওয়ার্ডের ভেতরে প্রচণ্ড গরম ও ভিড়। একটি বিছানায় দুই থেকে তিনটি শিশুকে রাখা হচ্ছে। শিশুরা কান্নাকাটি করে, ভেতরে থাকতে চায় না। তাই বেশির ভাগ সময় নাতিকে নিয়ে বাইরে খোলা বাতাসে থাকতে হয়। স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়ার সময় শুধু ভেতরে নেওয়া হয়।হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, রোগীর তুলনায় শৌচাগার কম। নারী-পুরুষকে একই শৌচাগার ব্যবহার করতে হচ্ছে। খাওয়ার পানিরও সংকট রয়েছে। রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে গেলেও অনেক সময় সেটি ব্যবহার করা যায় না। তখন হোটেল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।পঞ্চগড়ের জগদল সর্দারপাড়ার হোসেন আলী তাঁর অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, একটি বিছানায় দুই থেকে তিনজন রোগী রাখা হচ্ছে। ভেতরে শোয়ার তো দূরের কথা, বসার জায়গাও পাওয়া যায় না। প্রচণ্ড গরম ও ভিড়ের কারণে শিশুরা সেখানে থাকতে চায় না।একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানান বালিয়াডাঙ্গীর বড়পলাশবাড়ীর আবু বকর। তাঁর শিশু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। আবু বকর বলেন, হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি। প্রয়োজনীয় সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। ওয়ার্ডে ফ্যান থাকলেও প্রচণ্ড গরমে তাঁর শিশু কান্নাকাটি করে।এসব সমস্যা সম্পর্কে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফিরোজ জামান জুয়েল বলেন, সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ না পাওয়া এবং ক্যানুলা নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারকে জানানো হবে। ওষুধের বিষয়ে স্টোরকেও ডাকা হবে। পরিচ্ছন্নতার জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।হাসপাতালে শিশু রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি স্বীকার করে তত্ত্বাবধায়ক আরও বলেন, ৪৫ শয্যার জায়গায় কখনো প্রায় ২৫০ জনের মতো শিশু ভর্তি থাকে। শিশুদের সঙ্গে মা-বাবারাও অবস্থান করেন। ফলে ওয়ার্ডে মানুষের চাপ আরও বেড়ে যায়।
৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে দুই শতাধিক শিশুর চিকিৎসা চলায় হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশ ও সেবার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে অসুস্থ শিশুদের নিয়ে বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হওয়া অভিভাবকদের দুর্ভোগ উদ্বেগজনক। পর্যাপ্ত শয্যা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের দ্রুত বাস্তবায়ন চান ভুক্তভোগী অভিভাবকেরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জসিম উদ্দিন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত উত্তরের চোখ