প্রিন্ট এর তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬
সব সম্পত্তি সন্তানদের দিয়ে ৯৫ বছর বয়সে গাছতলায় বৃদ্ধ বাবা!
বাদল শেখ, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি ||
সারাজীবনের কষ্টার্জিত সম্পদ সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, জীবনের শেষ সময়ে তাঁদের কাছেই পাবেন আশ্রয় ও সেবা-যত্ন। কিন্তু সেই সন্তানদের কাছেই এখন যেন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ৯৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ হাজী শামসুল হক মোল্লা। দুই ছেলে ও চার মেয়ের কেউই তাঁকে নিজেদের কাছে রাখতে আগ্রহী নন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বাড়ির পাশে একটি গাছের নিচে তাঁকে ফেলে রাখার অভিযোগও উঠেছে সন্তানদের বিরুদ্ধে। হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি ঘটেছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরন গ্রামে। বৃদ্ধ হাজী শামসুল হক মোল্লা ওই গ্রামের মৃত ওমেদ আলী মোল্লার ছেলে।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শামসুল হক মোল্লার দুই ছেলে ও চার মেয়ে। বড় ছেলে আজিজুল মোল্লা পেশায় ফেরিওয়ালা এবং ছোট ছেলে রেয়াজুল মোল্লা বাসের হেলপার। চার মেয়ের মধ্যে মায়া বেগম, সাবিনা বেগম ও সালমা বেগমের বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে কাজুলী বেগম শারীরিক প্রতিবন্ধী। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবন্ধী ছোট মেয়েটি ছাড়া বাকি পাঁচ সন্তান নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বৃদ্ধ বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে চাইছেন না। জানা যায়, কয়েক বছর আগে নিজের জমি বিক্রি করে হজ পালন করেন শামসুল হক মোল্লা। এরপর অবশিষ্ট জমিজমাও সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন। কিন্তু স্ত্রীহারা এই বৃদ্ধের জীবনের শেষ সময়ে এসে সন্তানদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আশ্রয়, সেবা ও যত্ন না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, গত কয়েক দিন বড় মেয়ে মায়া বেগমের বাড়িতে ছিলেন বৃদ্ধ শামসুল হক। মঙ্গলবার সকালে মায়া বেগম তাঁকে দুই ভাইয়ের বাড়িতে নিয়ে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় দুই ছেলে ও তাঁদের স্ত্রীরা মিলে বৃদ্ধ বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে তাঁকে বাড়ির উঠানের পাশে একটি গাছের নিচে বসিয়ে রাখা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।এ বিষয়ে বড় মেয়ে মায়া বেগম বলেন, “আমার স্বামী অসুস্থ। তার ওপর বাড়িতে প্রতিবন্ধী ছোট বোন কাজুলী থাকে। সব মিলিয়ে বাবাকে নিজের কাছে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”মেজো মেয়ে সাবিনা বেগম বলেন, “চার বোনকে জমি বিক্রি করে বাবা মাত্র চার লাখ টাকা করে দিয়েছেন। অথচ দুই ভাইকে নগদ টাকাসহ আট কাঠা করে জমি দিয়েছেন। এখন আমরা বোনেরা কেন বাবার দেখাশোনা করব?”অন্যদিকে, এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত দুই ছেলে আজিজুল ও রেয়াজুলের বাড়িতে গেলে তাঁদের কাউকে পাওয়া যায়নি। তাঁদের স্ত্রীরাও গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রতিবেশী গৃহিণী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শামসুল হক মোল্লার সব জমিজমা লিখে নিয়ে এখন তাঁর সন্তানরা তাঁকে আশ্রয় দিচ্ছে না। তিনি যদি নিজের সম্পত্তি এভাবে লিখে না দিতেন, তাহলে হয়তো আজ তাঁকে এমন দুর্দশায় পড়তে হতো না। সন্তানদের এমন আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”এদিকে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ হাজী শামসুল হক মোল্লা। তিনি বলেন, “সারাজীবন তিল তিল করে কষ্ট করে যাদের বড় করলাম, আজ তারাই আমাকে বোঝা বানিয়ে দিল। আমি এখন কোথায় যাব, কী করব—কিছুই বুঝতে পারছি না।”ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ-উল-আরেফীন বলেন, “ঘটনাটি আমি জেনেছি এবং দ্রুত ঘটনাস্থলে যাচ্ছি। শামসুল হক সাহেবের সন্তানেরা যদি তাঁদের পিতার ভরণপোষণ ও দেখাশোনা না করেন, তাহলে প্রচলিত পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন বৃদ্ধ বাবার এমন অসহায়ত্ব শুধু একটি পরিবারের ঘটনা নয়, এটি সমাজের পারিবারিক মূল্যবোধ ও মানবিক দায়িত্ববোধ নিয়েও প্রশ্ন তোলে। যে সন্তানদের বড় করতে জীবনের সঞ্চয় ও সম্পদ ব্যয় করেছেন, শেষ বয়সে তাঁদের কাছেই আশ্রয় না পাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে হাজী শামসুল হক মোল্লা যেন নিরাপদ আশ্রয়, প্রয়োজনীয় সেবা-যত্ন ও প্রাপ্য সম্মান ফিরে পান।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জসিম উদ্দিন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত উত্তরের চোখ