প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৪ বছরের তানজিলা মাত্র ১০ মাসে কোরআনের হাফেজা
উত্তরের চোখ ||
পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা মুখস্থ করা—যে অর্জনের জন্য অনেক শিক্ষার্থীকে বছরের পর বছর কঠোর সাধনা করতে হয়। কিন্তু মাত্র ১০ মাসের অধ্যবসায়, একাগ্রতা আর শিক্ষিকাদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে সেই অসাধারণ কাজটি করে দেখিয়েছে ১৪ বছরের কিশোরী তানজিলা আক্তার।তানজিলার এই সাফল্যে এখন আনন্দের আবহ বিরাজ করছে পটুয়াখালীর মহিপুর থানা সদরের বিপিনপুরের জিলাপিতলায় অবস্থিত জামিয়া হযরত ওমর ফারুক (রা.) মাদরাসার বালিকা হিফজ শাখায়।পটুয়াখালীর মহিপুর সদর ইউনিয়নের নিজামপুর গ্রামের মেয়ে তানজিলা। বাবা হাফেজ মো. সালাউদ্দিন হাওলাদার পেশায় একজন অটোচালক। ছোটবেলা থেকেই কোরআনের প্রতি ছিল তানজিলার গভীর আগ্রহ।প্রায় ১০ মাস আগে সে মাদরাসাটির বালিকা শাখার হিফজখানায় ভর্তি হয়। এরপর শুরু হয় তার কঠিন সাধনার পথ। প্রতিদিন নিয়ম করে নতুন সবক মুখস্থ করা, পুরোনো পড়া ঝালিয়ে নেওয়া আর শিক্ষিকাদের নির্দেশনা মেনে চলার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে সে।কখনো ক্লান্তি এসেছে, কখনো কঠিন লেগেছে কোনো আয়াত। কিন্তু থেমে যায়নি তানজিলা। বরং কঠিন অংশগুলো বারবার অনুশীলন করে এগিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১০ মাসেই তার মুখস্থ হয়ে যায় পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা।তানজিলার এই অনন্য অর্জনকে স্মরণীয় করে রাখতে মঙ্গলবার বিকেলে মাদরাসার পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয় বিশেষ সম্মাননা স্মারক।সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। প্রিয় শিক্ষার্থীর এমন সাফল্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছিল আনন্দ ও গর্বের অনুভূতি।সম্মাননা হাতে পেয়ে তানজিলার চোখেমুখে ছিল আনন্দের ছাপ। সে জানায়, মাদরাসার শিক্ষিকারা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তাকে পাঠদান করেছেন। কোনো জায়গা কঠিন মনে হলে শিক্ষিকারা সহজ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন।তানজিলা বলে, অল্প সময়ে কোরআন হিফজ করতে পেরে সে খুবই খুশি। ভবিষ্যতেও নিয়মিত কোরআন পড়তে এবং কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে চায়।একমাত্র মেয়ের এমন গৌরবময় অর্জনে আবেগাপ্লুত বাবা হাফেজ মো. সালাউদ্দিন হাওলাদার। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়ের কোরআনের প্রতি আগ্রহ ছিল। হিফজের সময় অনেক পরিশ্রম করেছে তানজিলা। কখনো ক্লান্ত হলেও পড়াশোনা বন্ধ করেনি।মেয়ের এই অর্জনকে পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বলে উল্লেখ করে তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন এবং মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কমিটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।তানজিলার শিক্ষিকা হাফেজা মোসা. মারজিয়া আক্তার বলেন, তানজিলা অত্যন্ত মেধাবী ও মনোযোগী শিক্ষার্থী। নতুন সবক মুখস্থ করার পাশাপাশি পুরোনো পড়া ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তার আন্তরিকতা ছিল।তার ভাষ্য, অনেক সময় অন্যরা যখন বিশ্রাম নিত, তখনও তানজিলা কোরআন মাজিদ নিয়ে মগ্ন থাকত। নিয়মিত অনুশীলন এবং শিক্ষিকাদের নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলার কারণেই এত অল্প সময়ে সে হিফজ সম্পন্ন করতে পেরেছে।স্থানীয় আলেম ও ব্যবসায়ী হাফেজ মো. মতিন বলেন, কোরআন হিফজ করা অত্যন্ত মর্যাদার বিষয়। তবে শুধু কোরআন মুখস্থ করাই শেষ কথা নয়; এর অর্থ ও শিক্ষা অনুধাবন করে সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই প্রকৃত সাফল্য।তিনি জানান, এর আগে একই মাদরাসার বালক শাখা থেকেও মাত্র আট মাসে একজন শিক্ষার্থী কোরআনের ৩০ পারা হিফজ সম্পন্ন করেছিল। এবার বালিকা শাখার তানজিলা মাত্র ১০ মাসে হিফজ সম্পন্ন করায় পুরো মহিপুরবাসীর মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।মাদরাসার মুহতামিম মুফতি আবুল কালাম আজাদী বলেন, একজন ছাত্রীর জন্য পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা মুখস্থ করা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। মাত্র ১০ মাসে হিফজ সম্পন্ন করে তানজিলা প্রমাণ করেছে—সদিচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক পরিবেশ থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব।তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার মানোন্নয়নের পাশাপাশি তাদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নয়নের দিকেও মাদরাসা গুরুত্ব দেয়। তানজিলার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করবে।তানজিলার সম্মাননা ও দোয়া অনুষ্ঠানে মাদরাসার উপদেষ্টা হাফেজ আব্দুল বারেক, প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল খালেক কবিরাজ, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. মোস্তফা সরদার, সিনিয়র সহ-সভাপতি কিরণ হাওলাদার, সহ-সভাপতি মোশাররফ মুসুল্লি, নাজিমে তালিমাত হাফেজ মো. হারুন হাওলাদারসহ শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।অনুষ্ঠান শেষে তানজিলার দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।মাত্র ১০ মাসের এই পথচলা যেন তানজিলার জন্য নতুন এক অধ্যায়ের শুরু। কঠোর পরিশ্রম আর স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে ১৪ বছরের এই কিশোরী এখন কোরআনের হাফেজা—যার সাফল্যে গর্বিত পরিবার, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং পুরো মহিপুরবাসী।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জসিম উদ্দিন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত উত্তরের চোখ